বাংলা নববর্ষ

বাংলা নববর্ষের ইতিকথা

“এসো হে বৈশাখ”

“যাক পুরাতন স্মৃতি,

যাক ভুলে যাওয়া গীতি,

যাক অশ্রু বাষ্প সুদূরে মিলাক,

এসো হে বৈশাখ”

সুন্দর সাবলীল এই শব্দগুলো সুরের তারে বেঁধে পঞ্জিকার পাতায় যেই দিনটিকে আমরা স্বাগতম জানাই, তা হল বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন। ১লা বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ এর দিনটির মাধ্যমে বাংলা সনের সংখ্যাটি আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। অতীতের সব স্মৃতির সাথে বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনটিকে স্বাগত জানাতে, তাই থাকে অপেক্ষা। অপেক্ষা ভোরের... অপেক্ষা সূর্যের প্রথম কিরণের... অপেক্ষা বাংলা নববর্ষের! 

যদি বলি বাংলা নববর্ষের শুরুটা ঠিক কবে থেকে হয়েছিল? তবে তা জানতে আমাদের চলে যেতে হবে, মুঘল সাম্রাজ্যের আমলে। সে সময় সম্রাটেরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন যেহেতু চাঁদের উপর নির্ভরশীল থাকতো, তাই তা কৃষি ফলনের সাথে মিলতো না। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে, ঠিক সময়মতো কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতেই মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। সম্রাটের আদেশ অনুসারে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি, সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম ঠিক করেন। পরবর্তীতে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের সম্ভবত ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু করে হয়। প্রথমে এই সনের নাম রাখা হয় ‘ফসলি সন’। যা পরবর্তীতে ‘বঙ্গাব্দ’ বা ‘বাংলা নববর্ষ’ নামে পরিচিত পায়।

তবে আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের শুরুটা ছিল ১৯১৭ এর দিকে। যদিও ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি চালু হয় ১৯৬৭ সালের পরে। পরবর্তীতে ১০/১১ই মার্চ না রেখে, ১৪ই এপ্রিলকে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

বাংলার গ্রামীণ জীবনের সাথে বাংলা সনের প্রথম এই দিনটি মিশে আছে উৎসবের বিশেষ দিন হয়ে। সাধারণত বাড়িঘর পরিষ্কার রাখা, ব্যবহার্য সামগ্রী ধোয়ামোছা করার মাধ্যমে নেয়া হয় উৎসবের প্রস্তুতি। তৈরি করা হয় মিষ্টি-পিঠা-পায়েসসহ নানা রকম লোকজ খাবার। এছাড়া পান্তা সাথে ভাজা মাছ, আর হরেক ধরনের ভর্তা তো যোগ হচ্ছেই! একদিকে চলে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময়, আর প্রিয়জনকে উপহার দেওয়া; অন্যদিকে বৈশাখী মেলায় যাওয়ার অপেক্ষা। আর এসবই যে জানান দেয় উৎসবের। উৎসব বর্ষবরণের!

মঙ্গল শোভাযাত্রা

বাংলা নববর্ষ উদযাপন মানেই যেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের করা শোভাযাত্রা; যা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে প্রতি বছরই পহেলা বৈশাখে ঢাকা শহরের শাহবাগ-রমনা এলকায় এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই শোভাযাত্রায় চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

স্বৈরাচারী শাসনের বিরূদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একইসাথে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ তে সর্বপ্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু করা হয়। তবে ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে ‘চারুপীঠ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান যশোরে প্রথমবারের মতো নববর্ষ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে। পরবর্তীতে যশোরের সেই শোভাযাত্রার আদলেই ঢাকার চারুকলা থেকে শুরু হয় বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা। ১৯৯০ সালেও আনন্দ শোভাযাত্রায়ও নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি স্থান পায়। ১৯৯২ সালে আনন্দ শোভাযাত্রার সম্মুখে রং বেরংয়ের পোশাক পরিহিত ছাত্র-ছাত্রীদের কাঁধে ছিল বিরাট আকারের কুমির। বাঁশ এবং বহু বর্ণের কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল সেই কুমিরটি। আর এভাবেই প্রতি বছর বিভিন্ন প্রতিকৃতি বানানোর মধ্য দিয়েই চলে বর্ষ বরণের আয়োজন।

শোভাযাত্রার অনতম আকর্ষণ থাকে- বিশালকায় চারুকর্ম পুতুল, কুমীর, পেঁচা, পাখি ও ঘোড়াসহ, বিচিত্র সব মুখোশ ও সাজসজ্জা। সাথে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নৃত্য তো রয়েছেই। শোভাযাত্রায় আরও স্থান পায় বিশালকায় হাতি, বাঘের  কারুকর্ম। কৃত্রিম ঢাক আর অসংখ্য মুখোশ খচিত প্ল্যাকার্ডসহ মিছিলটি নাচে গানে মেতে উঠে।

বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদনক্রমে ২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কোর অধরা বা ইনট্যানজিবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ‌্যের তালিকায় স্থান লাভ করে। এর আগে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের বাউল গান ও ২০১৩ সালে জামদানী বয়ন শিল্প ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ‌্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তি লাভ করে।

 রমনার বটমূল উৎসব

বর্তমানে বৈশাখ মানেই রমনার বটমূল। রমনার বটমূলে গিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করা, রঙিন সাজে সবাইকে দেখা আর পান্তা-ইলিশ খাওয়া যেন এখন একরকম নিয়মেই পরিণত হয়েছে। তবে এই ধারা কিন্তু খুব বেশি পুরনো নয়। ১৯৬৭ সালের পহেলা বৈশাখ, বাংলা ১৩৭১ অব্দ থেকে রমনার বটমূলে ছায়ানট বাংলা নববর্ষ পালন শুরু করে। ছায়ানট বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ সাংস্কৃতিক সংগঠন। ১৯৬১ সালে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসব পালন করা ছাড়াও এই সংগঠন বাদ্যযন্ত্র, সংগীত, নৃত্য প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান ও সংগীত বিদ্যালয় পরিচালনা করে থাকে। ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারা’  গানটির মাধ্যমে শুরু হয় প্রথমবার বর্ষবরণের সেই উৎসব। কালক্রমে এই নববর্ষ পালনের উৎসব বর্ষবরণের জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাংলা পঞ্জিকায় নতুন বছরের প্রথম সূর্য কিরণের সঙ্গে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়। একক গান, সম্মেলক গান, আবৃত্তি ও পাঠ দিয়ে সাজানো হয় পুরো আয়োজন। এ আয়োজনে শামিল হতে ভোরেই রমনার বটমূলে নানা শ্রেণি, পেশা ও বয়সের মানুষের সমাগম ঘটে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পুরো অনুষ্ঠান উপভোগ করেন তারা। সেইসাথে চলে ভর্তা, ইলিশ ভাজা আর পান্তাভাত দিয়ে খাবার খাওার ধুম। রমনা বটমূলের আশেপাশে এই সময় চারুকলার অনেক শিক্ষার্থীকে পাওয়া যায়, যাদের হাতের রঙতুলি রাঙিয়ে দেয় মানুষকে। তো, এবারের পহেলা  বৈশাখে রমনা বটমূলে যাচ্ছেন তো?

হালখাতা

হালখাতা শব্দটা শুনলেই মনে হয় একটা লাল রঙের মোটা খাতা। কিন্তু শুধু একটা খাতাতে হালখাতা শব্দের মাহাত্ম্য শেষ হয়ে যায় না। হালখাতা একটা ঐতিহ্য। হালখাতা একটা রেওয়াজ। হালখাতা একটা উৎসব।

সেই সম্রাট আকবরের আমল থেকে ব্যবসায়ীরা এই হালখাতা পালন করে আসছে। অতীতে মুদি দোকান থেকে শুরু করে বড় বড় আড়তদার, সবার একটা বাকির খাতা থাকতো। বছরের প্রথম দিন সবাই সেই বাকি চুকিয়ে খাতার হিসাব বন্ধ করতো। আর নতুন হিসেবের খাতা খুলতো। এই হালখাতা রেওয়াজ শুধু বাকি পরিষদ বা দেনা পাওনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হালখাতার এই উৎসবকে ঘিরে মানুষের মধ্যে হৃদ্যতা বাড়তো। দেনাদার পাওনাদারের মধ্যে টাকার হিসেবের বাইরের যে সম্পর্ক তারই বহিঃপ্রকাশ এই হালখাতা।

ব্যবসায়ীদের কাছে সবসময়েই ক্রেতার সাথে সম্পর্ক অনেক গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এখন যাকে মার্কেটিং বা পাব্লিক রিলেশন বলা হয়, এই হালখাতা সেই অতীতের পাব্লিক রিলেশন। হালখাতার উৎসবকে কেন্দ্র ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায়ীক সম্পর্কে আরও একটু মজবুত করে তোলে। হালের হালখাতা হয়তো আগের মত নেই। তবে এখনও ব্যবসায়ীরা অন্যভাবে হালখাতা করেন। হিসেবের খাতায় নয়, সম্পর্কের হালখাতায় নতুন হিসেব খোলেন উপহার পাঠিয়ে।

বৈশাখী মেলা

‘মেলায় যাই রে... মেলায় যাই রে!’, এই গানটি গাইতে গাইতে বৈশাখী মেলায় যাওয়ার যে আনন্দ থাকে, তা বর্ষ বরণের এই দিনটিকে যেন আরও রঙিন করে তুলে। কী না থাকে সেই মেলায়! হাওয়াই চরকি, ডুগডুগি, ঢোল, খেলনা পুতুল, বাঁশি; আরও কত কী!  

বৈশাখী মেলা মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা হিসেবে স্বীকৃত। বৈশাখী মেলার আয়োজনে থাকে- স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য কারুপণ্য, লোকশিল্প পণ্য, কুটির শিল্প সামগ্রী, হস্তশিল্প ও মৃৎশিল্পের অনেক সামগ্রী। এছাড়া শিশু-কিশোরদের জন্য থাকে খেলনা, লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন- চিড়া, মুড়ি-মুড়কি, খই, বাতাসা এবং বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি। বৈশাখী মেলায় থাকেন বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোক নৃত্যশিল্পীরা। তাঁরা যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, গাজির গানসহ বিভিন্ন ধরনের লোকসংগীত, বাউল-মারফতি-মুর্শিদি-ভাটিয়ালি ইত্যাদি বিভিন্ন আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন। এছাড়া চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাটক, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদি বৈশাখী মেলার বিশেষ আকর্ষণ। শিশু-কিশোরদের আকর্ষণের জন্য থাকে- বায়োস্কোপ, পুতুলনাচ, নাগরদোলা।

বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলে বৈশাখী মেলার আসর বসে তার মধ্যে রয়েছে- নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, রংপুরের পায়রাবন্দ, দিনাজপুরের ফুলছড়ি ঘাট এলাকা, মহাস্থানগড়, কুমিল্লার লাঙ্গলকোট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মহেশপুর, খুলনার সাতগাছি, ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল অঞ্চল, সিলেটের জাফলং, মণিপুর, বরিশালের ব্যাসকাঠি-বাটনাতলা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ এলাকা ইত্যাদি।   

বউমেলা- ঈশা খাঁর সোনারগাঁওয়ে ব্যতিক্রমী এক মেলা বসে যার নাম, বউমেলা। স্থানীয়ভাবে যা ‘বটতলার মেলা’ নামেও পরিচিত। প্রাচীন একটি বটবৃক্ষের নিচে এই মেলা বসে।

ঘোড়ামেলা- এছাড়া সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আরেকটি মেলার আয়োজন করা হয়। এটির নাম ঘোড়ামেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করে রাখা হয় এবং আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই কলাপাতায় আনন্দের সঙ্গে তা ভোজন করেন। এছাড়া মেলায় নাগরদোলা, পুতুল নাচ এবং সার্কাসের আয়োজন করা হয়। আর এভাবেই বৈশাখের রঙে একত্রিত হয়ে বৈশাখকে স্বাগতম জানাই।

শুভ নববর্ষ ১৪২৫!

বাউল গান, যাত্রাপালা, পুতুল নাচ

বাংলাদেশের গ্রাম বাংলার আরো কিছু প্রাচীন ঐতিহ্যের নাম এগুলো। পহেলা বৈশাখের বৈশাখী মেলায় এদের প্রায় সবকিছুকেই দেখা যায়। মেলায় থাকে বাউলের গান। সেইসাথে থাকে যাত্রাপালা আর পুতুল নাচ। বাউল গানে বাউলেরা বাউল গান গেয়ে থাকে। একক এবং দলগতভাবে চলীই গানের উৎসব। অনেক রাত পর্যন্ত চলে এই গান। ছেলেমেয়ে, নারীপুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে দেখতে পাওয়া যায় এই গানের আসরে।

যাত্রাপালা আর মেলার যোগসূত্র অনেক আগের। যাত্রাপালায় স্থানীয়রা নানারকম নাট্যাভিনয় সরাসরি উপভোগের সুযোগ পান। যাত্রার শিল্পীরা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে নিজেদের কাজ করেন। অনেক সময় যাত্রায় সামাজিক গল্প, অনেক সময় প্রেম কাহিনীকে ফুটিয়ে তোলা হয়। পুতুল নাচ ভারত বাংলাদেশে প্রচলিত একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। গ্রামীণ জনপদে আবালবৃদ্ধ বনিতার বিনোদনে বিশেষ করে শিশুদের বিনোদনে পুতুল নাচ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ভারতীয় উপ-মহাদেশে বিপন পাল প্রথম পুতুল নাচের প্রচলন করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। বিপিন পাল তৎসময়ে সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পৌরানিক কাহিনী অবলম্বন করে পুতুল নাচ করতেন বলে জানা যায়। পুতুল নাচে পুতুলদের মাধ্যমে গল্পকে ফুটিয়ে তোলা  হয় সবার সামনে।

ঘুড়ি উৎসব

পহেলা বৈশাখ মানেই আমাদের ঐতিহ্য আর ভালোবাসার জিনিসগুলোকে একটু একটু করে আবার নিজেদের খুব কাছে নিয়ে আসা। একটা সময় ঘুড়ি ছিল বাংলাদেশের সবার জন্য আনন্দময় সময় কাটানোর সেরা একটি মাধ্যম। এই হারিয়ে যাওয়া বা প্রায় হারিয়ে ফেলা আনন্দগুলোকেই পহেলা বৈশাখে আরো একটু কাছে নিয়ে আসে ঘুড়ি উৎসব।

ঘুড়ি উৎসব মানে ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব। ঢাকা শহরে বর্তমানে ঘুড়ির সাথে পরিচয় আছে কিংবা সখ্যতা দেখা যায় খুব কম মানুষের। সেই দূরত্বকে দূরে ঠেলে দিতে পহেলা বৈশাখের  ঘুড়ি উৎসব অসম্ভব ভালো একটি ভূমিকা পালন করে।

কেবল ঢাকা নয়, দেশের আরো বিভিন্ন স্থানে উদযাপিত হয় ঘুড়ি উৎসব। কেবল নানারকম ঘুড়ি ওড়ানোই নয়, ঘুড়ি নিয়ে মেলাও বসে এই সময়।  চলে কৈইরা, চিলা, পতেঙ্গা, ফুল, বিমান, ময়ূরসহ বিভিন্ন ধরনের বাহারী রংয়ের ঘুড়ির প্রতিযোগিতা। ঢাকার মধ্যে পুরনো ঢাকা এবং এর আশেপাশে নরসিংদী এবং মানিকগঞ্জের মতো স্থানগুলোতে পড়ে যায় খন্ড খন্ড ঘুড়ি উৎসবের ধুম। বেশকিছু স্থানে বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় এই উৎসব। সাধারণত, সাকরাইন  বা চৈত্রসংক্রান্তিতে ঘুড়ি ওড়ানোর রেওয়াজ থাকলেও এর পরিপূর্ণতা পায় পহেলা বৈশাখেই।

বৈশাখের খাবার-দাবার

বাংলা বছরের প্রথম দিনে যেমন বাঙ্গালী সাজে রঙ্গিন সাজে তেমনি সাজে বাঙ্গালীর হেঁশেল ও। সকলের চেষ্টা থাকে পোশাকের পাশাপাশি বাঙ্গালীর আচার রীতি, খাবার সব কিছুতেই থাকে বাঙ্গালীয়ানার স্বত্তাকে ধারণ করার। বাঙ্গালীর বৈশাখ আয়োজনে পান্তা ইলিশ ব্যতীত অসম্পূর্ণ থাকে। তবে শুধু পান্তা ইলিশ না, থাকে নানান রকম ভর্তা, ছোট মাছের মত বাঙ্গালী খাবার।

নববর্ষের সকালের শুরুটাই হয় পান্তা ভাত দিয়ে। সাথে থাকে কয়েক পদের ভর্তা, নানা রকমের সবজি ভাজি। মাছ নিয়ে বাঙালির উৎসাহ কম থাকে না পয়লা বৈশাখের দিনে। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদ থেকে এই ধারার প্রচলন হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। সুতরাং সারা বছরই যাতে মাছ খাওয়া যায়, তাই বছরের শুরুর দিনক্ষণ পয়লা বৈশাখ থেকে এ ধারা বজায় রাখা চাই। অনেকে আবার বর্ষবরণের মেন্যুতে রাখেন খিচুড়ীও।

নতুন বছরে থাকে মিষ্টিমুখেরও সুব্যবস্থা। এতেও থাকে বাঙ্গালিয়ানার ছোঁয়া। নতুন বছরের মিষ্টির তালিকায় থাকে সন্দেশ, মুড়কি, খই, মোয়া, জিলিপি, বাতাসার মত খাঁটি বাঙ্গালী খাবার।  পয়লা বৈশাখে হিন্দু সম্প্রদায় চালের নাড়ু তৈরি করে রাখে এবং তা পয়লা জ্যৈষ্ঠে খায়। এ-সম্পর্কিত একটি প্রবাদও রয়েছে—বৈশাখে রাখে, জ্যৈষ্ঠে খায়/যত পায়, তত চায়। শুধু নাড়ু নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু পরিবারগুলোতে তৈরি হতো মোয়া, মুড়ি-মুড়কি ইত্যাদি। চিত্রিত বা শখের হাঁড়িতে করে যেসব মুসলিম পরিবারের সঙ্গে তাদের সখ্য ছিল, তাদের বাড়িতে পাঠানো হতো পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছাস্বরূপ। আর মুসলিম পরিবারগুলোতে পিঠা-পুলি।

 

বৈশাখের পোশাক

বিগত বছরের সুখ-দুঃখ, আনন্দ বেদনার হিসাব চুকে নতুন বছরের নতুন স্বপ্ন আর সম্ভাবনার প্রত্যাশা আর মঙ্গল কামনায় পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণ উৎসব উদযাপন করা হয়। ঈদ বা পূজার মত এ উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ নতুন পোশাক।

মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে বাংলা সন প্রবর্তন এবং বর্ষবরণ উদযাপন শুরু হলেও দিনটিতে নতুন পোশাক পরার প্রচলন ছিল না। বহু আগে থেকেই হিন্দু নারীরা পূর্জা-পার্বণে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরতেন। ধারণা করা হয় সেখান থেকেই বাংলা নববর্ষে লাল-সাদার প্রচলন শুরু হয়।

৮০ দশকের শুরুর দিকে ঢাকাতে পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা শাড়ি পরার প্রচলন শুরু হয়। দীর্ঘসময় পর্যন্ত এটাই ছিল পহেলা বৈশাখের পোশাকের কেন্দ্রীয় রং এবং তাতে কোনো নকশার ব্যবহার ছিল না। ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা তাঁত, সুতি, খাদি এবং সিল্ক শাড়ি পরার চল শুরু হলেও সালোয়ার-কামিজ পরার চলটা সেভাবে ছিল না। পহেলা বৈশাখে নতুন পোশাক পরার চল সে সময় ছিল কেবল শহরকেন্দ্রিক। ’৯০ দশকের দিকে থেকে অনেকেই পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি পরতে শুরু করে। লাল-সাদা শাড়ির জমিন এবং পাড়ে ঢোল, তবলা, জীবজন্তু ছবির নকশার ব্যবহারও দেখা যায়।

তবে তা এখনকার মতো ব্যাপক ছিল না। এ চার দশকে বৈশাখী পোশাকের নকশায়, মোটিভে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। শুধুই লাল-সাদা স্থলে এখন তুলে ধরা হচ্ছে আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, ঐহিত্য, প্রকৃতি সবকিছু। মূলত ২০০৬ সালের দিক থেকে পহেলা বৈশাখের পোশাক ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এলোমেলো নকশা থেকে পহেলা বৈশাখী নিয়ে মোটিফভিত্তিক কাজ শুরু হয়। রঙের ক্ষেত্রে লাল-সাদাকে ভেঙে আরও কিছু রং যুক্ত করার ভাবনা আসে। শখের হাঁড়ির লাল-নীল-হলুদ, ফুলের মেজেন্ডা, হলুদ, প্রকৃতির সবুজ, পোড়ামাটির টেরাকোটা রং লাল-সাদার সঙ্গে যুক্ত করে ফ্যাশন ডিজাইনাররা কাজ করতে শুরু করেন। আর এখন তো পহেলা বৈশাখ পোশাক নিয়ে ব্যাপক পরিসরে কাজ হচ্ছে।তবে বৈশাখের পোশাকের এ পরিবর্তনটা আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে ঘিরেই আবর্তিত। বৈশাখী পোশাক এখন আর শুধুই পোশাক নয়, আমাদের পরিচয়।

 মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেরাও পিছিয়ে নেই পহেলা বৈশাখের উৎসবে । হয়ত বৈশাখের সকালের শুরুটা হয় চিরায়ত বাঙ্গালী পুরুষের পোশাক লুঙ্গী দিয়ে। সাথে কেউ পড়েন ফতুয়া কেউ বা পড়েন লুঙ্গী। মেয়েদের সাদা শাড়ি লাল পাড়ের সাথে মিলিয়ে ছেলেরাও পড়েন সাদা বা ঘিয়া রঙের পাঞ্জাবী। বৈশাখের এই দিনটিতে সকলেরই চেষ্টা থাকে বাঙ্গালীর সংস্কৃতি ও স্বত্তা সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে।